সোমবার । ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ । ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি : চাপ, বাস্তবতা নীতিগত প্রশ্ন

নিয়াজ মাহমুদ

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা নতুন কিছু নয়। ইতিহাস বলছে, ভূরাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে তেলের দামের একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সরবরাহ বিঘ্নিত হলে দাম বাড়ে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কমে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই স্বাভাবিক বাজার-প্রক্রিয়া কি সব দেশে সমানভাবে প্রতিফলিত হয়? বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে তেলের দাম একবার বাড়লে তা কমার নজির খুবই কম। ফলে বৈশ্বিক বাজারে স্বস্তি এলেও দেশীয় বাজারে সেই স্বস্তির প্রতিফলন দেখা যায় না।

সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সেই পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিন, সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য হারে মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সঙ্গে এলপিজির দামও বেড়েছে। এই সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে জনজীবনে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।

অর্থনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো, জ্বালানি অর্থনীতির একটি প্রধান ইনপুট। অর্থাৎ, প্রায় সব ধরনের উৎপাদন, পরিবহন ও সেবা খাতে জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি ও পরোক্ষভাবে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম ধাক্কাটি লাগে পরিবহন খাতে। ডিজেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পণ্যবাহী ট্রাক, বাসসহ সব ধরনের যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়। এর ফল হিসেবে পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই বর্তায়।

পরিবহন ব্যয় বাড়লে সরবরাহ ব্যবস্থায় খরচ বেড়ে যায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানী বা শহরাঞ্চলে পণ্য আনা-নেওয়ার খরচ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। ইতোমধ্যেই কাঁচাবাজারে তার প্রভাব দৃশ্যমান, সবজি, ডিমসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এটি কেবল একটি সাময়িক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন-এর সূচনা, যেখানে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ে।

শিল্প খাতেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। অনেক কারখানা সরাসরি জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে যেখানে গ্যাস বা বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। জেনারেটর চালাতে ডিজেলের প্রয়োজন হয়। তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, যা পণ্যের দামে প্রতিফলিত হয়। এর ফলে স্থানীয় বাজারে ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়ে, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও কমে যায়। বিশেষ করে রপ্তানিনির্ভর খাত, যেমন তৈরি পোশাক শিল্প, এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

কৃষি খাতের অবস্থাও একই রকম উদ্বেগজনক। দেশে সেচের জন্য ব্যাপকভাবে ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহৃত হয়। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচ সরাসরি বেড়ে যায়। ধান, গম, সবজি, সব ধরনের ফসল উৎপাদনে খরচ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও একটি ঝুঁকি।

সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর। কারণ তাদের আয় সাধারণত স্থির থাকে, কিন্তু ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ, খাদ্যপণ্যের দাম, বাসাভাড়া, সবকিছুতেই প্রভাব পড়ে। ফলে প্রকৃত আয় কমে যায়। শ্রমজীবী মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, কারণ তাদের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের এই অসামঞ্জস্য দ্রুত বাড়ে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন উঠে আসে, কেন বাংলাদেশে জ্বালানির দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কমানো হয় না? সরকার প্রায়ই যুক্তি দেয় যে ভর্তুকির চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দাম সমন্বয় করা হয়। কিন্তু যখন বিশ্ববাজারে দাম কমে, তখন সেই যুক্তি কেন কার্যকর হয় না? এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

আরেকটি বিষয় হলো মূল্য সমন্বয়ের পদ্ধতি। এক ধাক্কায় বড় অঙ্কের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর হঠাৎ চাপ সৃষ্টি করে। অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন, ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয় করলে এই চাপ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হতো। এতে বাজারও ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে পারত এবং মূল্যস্ফীতির ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কম পড়ত।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কেবল জ্বালানির দামের ওপর নির্ভর করে না, বরং চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে। এই বক্তব্য আংশিকভাবে সত্য। কিন্তু জ্বালানি যেহেতু প্রায় সব খাতের একটি মৌলিক উপাদান, তাই এর দামের পরিবর্তন চাহিদা-সরবরাহের ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করে। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে মূল্যস্ফীতি থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

এছাড়া বাজার ব্যবস্থাপনাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বালানির দাম বাড়ার পর অনেক ক্ষেত্রে অসাধু ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা করার সুযোগ নেয়। তারা আনুপাতিক হারের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর বাজার তদারকি অত্যন্ত জরুরি।

জ্বালানি খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নীতির স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা। যদি একটি স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিতভাবে দাম সমন্বয় করা হয়, কার্যকরভাবে চালু থাকে, তাহলে হঠাৎ করে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন পড়ে না। এতে ভোক্তা ও ব্যবসায়ী উভয়ই আগাম প্রস্তুতি নিতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার কিছুটা বাধ্য হয়েই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমন যুক্তিও পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় এবং ভর্তুকির চাপ, এসব বাস্তবতা রয়েছে। তবে নীতিগতভাবে একটি ভারসাম্য খুঁজে বের করা জরুরি, যেখানে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও সহনীয় রাখা যায়।

সমাধান কী? প্রথমত, মূল্য সমন্বয়ে ধাপে ধাপে পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। দ্বিতীয়ত, বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে যাতে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা যায়। তৃতীয়ত, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, যেমন টার্গেটেড ভর্তুকি বা নগদ সহায়তা, বাড়ানো যেতে পারে। চতুর্থত, জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, বাড়ানো জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা হলেও এর ব্যবস্থাপনা একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্ত কতটা সংবেদনশীল, স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হচ্ছে, সেটিই নির্ধারণ করবে এর প্রভাব কতটা সহনীয় হবে। বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের সামনে আবারও সেই প্রশ্নটি তুলে ধরেছে, আমরা কি কেবল সংকটের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি, নাকি একটি টেকসই ও ন্যায়সঙ্গত জ্বালানি নীতির দিকে এগোচ্ছি?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: niazjournalist@gmail.com

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন